আপনি কি জানেন মাহে রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব গুলো কি কি.?

136
Spread the love
  1. মাহে রমজানের ফজিলত ও গুরুত্বঃ
  2. সাহরীর ফজিলত ও গুরুত্বঃ
  3. ইফতারের ফজিলত ও গুরুত্বঃ
  4. তারাবীহ নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব

. আল্লামা খলিলুর রহমান

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

আরবি বর্ষপঞ্জির

নবম মাস রমজান। রমজান মুসলমানদের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। মহান আল্লাহ্ তা’আলা এই রমজান মাসকে করেছেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বছরের বাকি এগারোটি মাসের থেকে এই মাসটি সমহিমায় উদ্ভাসিত।

ফারসি শব্দ রোজার আরবি অর্থ হচ্ছে সওম, বহুবচনে সিয়াম। সওম বা সিয়ামের বাংলা অর্থ বিরত থাকা। ইসলামী শরীয়তে সওম হল আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশে নিয়তসহ সুবহে সাদিকের শুরু থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকা।

রোজা ফরজ সংক্রান্ত আয়াত নাজিলঃ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

২য় হিজরীর শাবান মাসে মদীনায় রোজা ফরজ সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয় “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা সংযমী হও। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসকে পায় সে যেন রোজা রাখে”।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ [البقرة:183].

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।’ (সূরা বাকারা, ১৮৩ আয়াত)।

রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ (يونس: 58)

বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। [সূরা ইউনুস : ৫৮]

পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :—

أتاكم رمضان شهر مبارك

তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন :—

فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. رواه النسائي

আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। বর্ণনায় : নাসায়ী

আমাদের কর্তব্য : আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা।

রমজানের ফজিলত ও গুরুত্বঃ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

প্রিয় নবীজি (সা.) এর প্রিয় সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাস আসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। (বুখারী, মুসলিম)

অপর হাদিসে এসেছে, হযরত শাহ্ ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন, বেহেশতের ৮টি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে ১টি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যতিত আর কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)

বিখ্যাত হাদিস বিশারদ সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, হুজুর (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমযান মাসের রাতে এবাদত করে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদত করে কাটাবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম)

পবিত্র রমজানের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসের কিতাব গুলোতে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর ভেতর থেকে কিছু হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো-

এই মাসটি যে সকল কারণে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলি হলো:

১. রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান থেকে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম (সা.)-এর প্রতি নাজিল হয়েছে। এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)কে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসূল (সা.)ও তাঁকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দুই বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন।

এ মাসে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়, জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রমজান মাস এলে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়; জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০০)

২. এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল ক্বদরের ন্যায় বরকতময় রজনী : মহান আল্লাহ বলেন, ‘লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাত্রে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে, তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিময় এ রজনী, ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ (সূরা আল ক্বদর : ৩-৫)

৩. এ মাস দোয়া কবুলের মাস : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘(রমজানের) প্রতি দিন ও রাতে (জাহান্নাম থেকে) আল্লাহর কাছে বহু বান্দা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়ে থাকে (যা সে রমজান মাসে করে থাকে)।’ (সহীহ সনদে ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং ৭৪৫০)

৪. রোজার পুরস্কার আল্লাহ স্বয়ং নিজে প্রদান করবেন : হাদিসে কুদসিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলেন, ‘বনি আদমের সকল আমল তার জন্য, অবশ্য রোজার কথা আলাদা, কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর পুরস্কার দেবো।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)

৫. রোজা রাখা গোনাহের কাফফারা স্বরূপ এবং ক্ষমা লাভের কারণ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রামাদান মাসে রোজা রাখবে, তার পূর্বের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৯১০)

৬. রোজা জান্নাত লাভের পথ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যাকে বলা হয় রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে রোজাদারগণ প্রবেশ করবে। অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না, রোজাদারগণ প্রবেশ করলে এ দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১৭৯৭)

৭. রোজাদারের জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন রোজা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির কামনা হতে বাধা দিয়েছি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুমাতে দেইনি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। ফলে এ দুয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ (মুসনাদ, হাদিস নং ৬৬২৬)। রোজা জাহান্নামের অগ্নি থেকে মুক্তিলাভের ঢাল : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখে আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের মাঝে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করেন।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)

৮. এ মাসের রোজা রাখা একাধারে বছরের দশ মাস রোজা রাখার সমান : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজা দশ মাসের রোজার সমতুল্য, ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান, এ যেন সারা বছরের রোজা।’

রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও সুগন্ধিময়।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)

৯. রোজা ইহ-পরকালে সুখ-শান্তি লাভের উপায় : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটো খুশির সময় রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি স্বীয় প্রভু আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার সময়।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)

রোজার আরো ফজিলতের মধ্যে রয়েছে- এতে ইচ্ছা ও সঙ্কল্পে দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়, চারিত্রিক মাহাত্ম্য অর্জিত হয়, শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং সর্বোপরি তা মুসলিম উম্মাহ্ একতাবদ্ধ হওয়ার এক বাস্তব নিদর্শন।

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন:

“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান করার বা জিকরের (সওয়াবের) সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং প্রার্থনা বা দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কোরআন তিলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।”

উপর্যুক্ত গুরুত্বসমূহ ছাড়াও আরো যে সকল গুরুত্ব আছে সেগুলি হলো, দরিদ্র-অসহায়দের সহযোগিতার (দান-খয়রাত) মাস, বদরের মাস, জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস, এতেকাফের মাস, যাকাত ও দান-সদকা বেশি বেশি দেয়ার মাস, চরিত্র গঠনের মাস, আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস ইত্যাদি।

রোযার নিয়ত সংক্রান্ত মাসায়েলঃ

“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””‘

মুখে নিয়ত করা জরুরি নয়, অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে। তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম। (ফতোয়াতে শামি : খ. ৩, পৃ. ৩৪৫)

নিয়ত আরবিতে হওয়া জরুরি নয়। যেকোনো ভাষায় নিয়ত করা যায়। নিয়ত এভাবে করা যায়—আমি আজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। (জাওয়াহিরুল ফিকাহ : খ. ১, পৃ. ৩৭৮)

সূর্য হেলে পড়ার দেড় ঘণ্টা আগ পর্যন্ত রমজানের রোজার নিয়ত করা বৈধ। তবে রাতে নিয়ত করাই উত্তম। (ফতোয়াতে তাতার খানিয়া : খ. ২, পৃ. ২৭০; আহসানুল ফাতওয়া : খ. ৪, পৃ. ৪৪৬; জাওয়াহিরুল ফিকাহ : খ. ১, পৃ. ৩৭৮)

রমজানে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে খাওয়াটাই নিয়ত। যদি কোনো কিছু খাওয়া অথবা পান করা না হয়, তাহলে সূর্য হেলে পড়ার দেড় ঘণ্টার আগেই নিয়ত করে নেবে। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়া : খ. ৩, পৃ. ৩৭)

যদি কেউ সূর্য হেলে পড়ার আগে নিয়ত করে যে আমি এই সময় থেকে রোজাদার, তাহলে তার রোজা শুদ্ধ হবে না। (ফতোয়ায়ে শামি : খ. ৩, পৃ. ৩৭)

হানাফি মাজহাব মতে, নিয়ত ছাড়া রোজা শুদ্ধ হয় না। (তাতার খানিয়া : খ. ২, পৃ. ২৭০)

প্রতিটি রোজার জন্য পৃথক পৃথক নিয়ত করা আবশ্যক। সব রোজার জন্য প্রথম রোজার নিয়ত যথেষ্ট নয়। (ফতোয়াতে রহিমিয়া : খ. ২, পৃ. ১৫)

যে ব্যক্তি পুরো রমজানই রোজা রাখা বা না রাখার কিছুই নিয়ত করেনি, তাহলে সে কাজা করে নেবে। (ফতোয়ায়ে তাতার খানিয়া : খ. ২, পৃ. ২৭১)

 

#সেহরীর ফজিলত সেহরীর সুন্নত সময়ঃ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

* عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : تسحروا فإن في السحور بركة . متفق عليه

আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ ( সাঃ ) বলেনঃ তোমার সেহরী খাও । কেননা সেহরীতে বরকত রয়েছে।

* وعن زيد بن ثابت رضي الله عنه قال : تسحرنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم قمنا إلي الصلاة. قيل: كم كان بينهما؟ قال: قدر خمسين آية . متفق عليه

যায়েদ ইবনে সাবেত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এর সাথে সেহরী খেয়েছি, অতঃপর নামাজে দাঁড়িয়েছি’।তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল ‘ওই দুয়ের (ফজরের নামাজ ও সেহরী) মাঝখানে ব্যবধান কতক্ষণ ছিল?’ তিনি বললেনঃ (‘প্রায়) পঞ্চাশ আয়াত পড়ার মত সময়।’

পর্যালোচনা: সেহরী শেষ সময় খাওয়া সুন্নত। আমরা অনেকেই মনে করি শেষ সময় অর্থাৎ আযান হওয়া পর্যন্ত খাওয়া সুন্নত ।কিন্তু দ্বিতীয় হাদিস থেকে বুঝা যায়, রাসূল (সাঃ ) ও সাহাবারা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম ) আযানের পূর্বে পঞ্চাশ আয়াত তেলাওয়াত পরিমাণ সময় থাকতে সেহরী শেষ করতেন।

اللهم تقبل صيامنا وجميع أعمالنا كما تقبلت من عبادك الصالحين.

হযরত আমর বিন আনাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলিয়াছেন, আমাদের রোজা ও আহলে কিতাব অর্থাৎ (ইহুদী নাসারা) দের রোজার মধ্যে পার্থক্য হইল সেহরী খাওয়া।। [মুসলিম]

প্রাসঙ্গিক আলোচনাঃ আহলে কিতাব তথা ইহুদী খৃষ্টানদের ধর্মেও রোজার প্রচলন ছিল। এখনোও তারা রোজার সাদৃশ্যে উপবাস যাপন করে, কিন্তু সেহরী খায়না। তাই আমাদের প্রতি নির্দেশ আমরা সেহরী খাইয়া যেন তাদের সাদৃশ্য হইতে আলাদা হইয়া পড়ি। শেষ রাত্রে খাওয়াকে সেহরী বলে, সেহরী খাওয়া সুন্নত। এই খানার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তাই প্রয়োজন না থাকিলেও কিছু পানাহার করিতে হয়, নতুবা মাকরুহ হইবে।

রাসূল (সাঃ)বলেছেন সেহরী খাওয়া বরকতময় কাজ।সুতারাং তোমরা তা পরিত্যাগ কর না।এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও সেহরী কর।কারন যারা সেহরী খায় আল্লাহ তাদের উপর রহমত বর্ষন করেন এবং ফেরেস্তারা তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।[মুসনাদে আহমদ,মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা,ইবনে হিব্বান]

সেহরীর নিয়ত বা রোজা রাখার নিয়ত:

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم

(নাওয়াইতু আন আছুমা গদাম মিং শাহরি রমাদ্বানাল মুবারকি ফারদ্বল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাক্বব্বাল মিন্নী ইন্নাকা আংতাস সামীউল আলীম)

অর্থ: হে আল্লাহ! আগামীকাল পবিত্র রমযান মাসে তোমার পক্ষ হতে ফরয করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম, অতএব তুমি আমার পক্ষ হতে কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

রোজার বাংলা নিয়তঃ হে আল্লাহ পাক! আপনার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকালের রমাদ্বান শরীফ-এর ফরয রোযা রাখার নিয়ত করছি। আমার তরফ থেকে আপনি তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা , সর্বজ্ঞাত।

সেহরীর সংক্রান্ত মাসায়েল সমুহঃ

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

সাহরি খাওয়া সুন্নত। পেটে ক্ষুধা না থাকলে দু-একটি খেজুর খেয়ে নেওয়া উত্তম অথবা অন্য কোনো জিনিস খেয়ে নেবে। (হেদায়া : খ. ১, পৃ. ১৮৬)

বিলম্বে সাহরি খাওয়া উত্তম। আগে খাওয়া হয়ে গেলে শেষ সময়ে কিছু চা, পানি, পান ইত্যাদি খেলেও সাহরির ফজিলত অর্জিত হবে। (হেদায়া : খ. ১, পৃ. ১৮৬)

সন্দেহ হয়, এমন সময় সাহরি খাওয়া মাকরুহ। (আলমগীরী : খ. ১, পৃ. ২০১)

সঠিক ক্যালেন্ডারে সুবহে সাদিকের যে সময় দেওয়া থাকে, তার দু-চার মিনিট আগে খানা বন্ধ করে দেবে। এক-দুই মিনিট আগে-পিছে হলে রোজা হয়ে যাবে, তবে ১০ মিনিট পর খাওয়ার দ্বারা রোজা হবে না। (আপকে মাসায়েল : খ. ৩, পৃ. ২০১) কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধু ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, কেননা অনেক সময় তাতে ভুলও হয়ে থাকে, তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার।

নিদ্রার কারণে সাহরি না খেতে পারলেও রোজা রাখতে হবে। সাহরি না খেতে পারায় রোজা না রাখা অত্যন্ত পাপ। (বেহেশতি জেওর : পৃ. ৩৫৩)

আল্লাহ’তালা মুসলিম উম্মাহকে সেহরী খাওয়ার ফলে হাদিসে ঘোষিত ফজিলত,বরকত,কল্যান লাভে রাসূল (সাঃ)এর সুন্নত পালনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সাহরী খাওয়ার তৌফিক দান কর।আমিন……

Eid mubarak lantern background vector

#ইফতার কি?

:::::::::::::::::::::

ইফতার শব্দটি আরবি ফুতুর শব্দ থেকে এসেছে। ফুতুর- অর্থ নাস্তা। ইফতারের অর্থ খোলা, উন্মুক্ত করা, ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে সূর্যাস্তের পর কিছু খেয়ে বা পান করে খেজুর, পানি বা কোনো খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণের মাধ্যমে রোজা ছেড়ে দেয়াকে ইফতার বলে।

ইফতারের ফজিলত গুরুত্ব:

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

এই পবিত্র রমজানুল মোবারকের অন্যতম দান হলো ইফতার।

ইফতারের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে স্বয়ং রাসুল (সা.) বলেছেন,‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে

১. ইফতারের সময়

২. মহান আল্লাহর সঙ্গে মোলাকাত বা সাক্ষাতের সময়’। (বোখারি ও মুসলিম)।

ইফতার রমজানের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক বিশেষ নিয়ামত। এটি পালন শুধু কর্তব্য নয়, আনন্দও বটে। এতে আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।ইফতারের সময় সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, সুবহে সাদিক হতে রাত অবধি রোজা পূর্ণ করো। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৭) অর্থাৎ সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোজা শেষ করে ইফতার করা।

হজরত সালমান ইবনে আমের আদ-দাব্বি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করে তখন তার খুরমা খেজুর দিয়ে ইফতার করা উচিত। তবে যদি সে খুরমা খেজুর না পায়, তাহলে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কারণ, পানি পবিত্র। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.) নামাজের আগে ইফতার করতেন কয়েকটি টাটকা খেজুর দিয়ে। যদি তিনি টাটকা খেজুর না পেতেন তাহলে শুকনা খেজুর (খুরমা) দিয়ে ইফতার করতেন। আর তাও যদি না পেতেন, তাহলে কয়েক ঢোক পানি পান করে নিতেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা সুন্নত এবং সূর্যাস্তের আগে ইফতারি সামনে নিয়ে বসে থাকা মোস্তাহাব।

সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, মানুষ কল্যাণের সঙ্গে থাকবে তত কাল, যত কাল তারা শিগগির ইফতার করবে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

রসুল (সা.) আরো ফরমান, দ্বীন জয়ী থাকবে তত দিন, যত দিন লোক শিগগির ইফতার করবে। কেননা ইহুদি খ্রিষ্টানরা ইফতার করে দেরিতে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজা শরিফ)

ইফতার সম্পর্কে রসুল (সা.) আরো বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় তারাই, যারা আগেভাগে ইফতার করে। (তিরমিজি শরিফ)

রোজাদারদের যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য তিনি দেরি করে সেহরি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করার নির্দেশ করেছেন। ইফতারের এ বিধান ইসলাম ধর্মেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইফতারে ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্তর নিঃসৃত ভালোবাসার ছোঁয়া এবং আধ্যাত্মিক ভাবের যে প্রতিফলন ঘটে, তা সত্যিই অতুলনীয়।

ইফতারের সুন্নত সমুহঃ

“”””””””””””””””””””””””””””””””””

খুরমা, খেজুর বা মিষ্টান্ন দ্বারা ইফতার করা সর্বাপেক্ষা উত্তম; যদি তা দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে যেকোনো ফল দ্বারা ইফতার করা ভালো। আর যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে যেকোনো হালাল খাদ্যবস্তু দ্বারা এমন কি শুধু পানির দ্বারাও ইফতার করা যায়।

হজরত সালমান ইবনে আমির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: তোমাদের কেউ রোজা রাখলে খেজুর দিয়ে যেন ইফতার করে, খেজুর না হলে পানি দ্বারা; নিশ্চয় পানি পবিত্র। (আহমাদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও দারেমি শরিফ; আলফিয়্যাতুল হাদিস: ৫৬২, পৃষ্ঠা: ১৩১-১৩২)।

হাদিসে পানিমিশ্রিত দুধ (ঘোল ও মাঠা) দ্বারা ইফতার করার হুকুমও বর্ণিত রয়েছে। মাগরিবের নামাজের আগে ইফতার করা মোস্তাহাব বা উত্তম।

দোয়া কবুলের অন্যতম সময়ঃ

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের সময় সত্যি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অদৃশ্য শক্তির আদেশ পালনার্থে ভীষণ ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও বনি আদম প্রহর গুনতে থাকে সূর্যাস্তের। এ সময় মহান আল্লাহ আদম জাতির ওপর সন্তুষ্ট হয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘ইফতার করার সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হয়ে থাকে।’ (আবু দাউদ শরীফ)

আর এ জন্যই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) ইফতারের সময় পরিবারের সবাইকে সমবেত করে দোয়া করতেন।

মহা পুণ্যের কাজ ইফতার করানোঃ

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

মাহে রমজান ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির শিক্ষা দিয়ে থাকে। এ মাসের কারণে মানুষ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার জ্বালা বুঝতে পারে। এ জন্য এক মুমিনের হৃদয় ধাবিত হয় অন্য মুমিনের সুখ-দুঃখের খবর সন্ধানে। যার বাস্তব রূপ প্রকাশ পায় ইফতারের মাধ্যমে। রাসূলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার গুনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে। সে দোজখ থেকে মুক্তি পাবে আরসে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, কিন্তু এতে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই ঘাটতি হবে না অর্থাৎ রোজাদারের সওয়াব কমবে না।

এরূপ সওয়াব আল্লাহতায়ালা এমন ব্যক্তিকে দেবেন, যে শুধু এক পেয়ালা দুধ অথবা একটি খেজুর বা সামান্য পরিমাণ পানি দ্বারাও কাউকে ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে হাউজে কাওসারথেকে এমন শরবত পান করাবেন যাতে সে কখনও তৃষিত হবে না। এভাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বায়হাকি)

সাহাবীরা বলেন, হে আল্লাহর রসূল (স.) আমাদের এমন সংস্থান নেই যা দিয়ে আমরা কাওকে ইফতার করাতে পারি? তিনি (স.) বলেন, আল্লাহ তাকেও এই সওয়াব দেবেন, যে ব্যক্তি কোন রোজা পালনকারীকে এক ঢোক দুধ অথবা একটা শুকনো খেজুর কিংবা এক চুমুক পানি দিয়েও ইফতার করাবে আর যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্তি সহকারে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে আমার “হাউজে কাওছার” থেকে এমন ভাবে পানি পান করাবেন যার ফলে, সে জান্নাতে না পৌছানো পর্যন্ত আর তৃষ্ণার্ত হবে না। ( বায়হাকী ওয়াবুল ঈমান, মেশকাত ১৭৪ পৃষ্ঠা) ।

ইফতারের আরবী দোয়া:

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””

ইফতারের আগ মুহূর্তে বেশি বেশি ইসতেগফার পড়াঃ

اَسْتَغْفِرُ اللهَ الْعَظِيْم – اَلَّذِىْ لَا اِلَهَ اِلَّا هُوَ اَلْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَ اَتُوْبُ اِلَيْهِ لَا حَوْلَ وَ لَا قُوَّةَ اِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِىِّ الْعَظِيْم

আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম, আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লাহু আল-হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।

ইফতারের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দোয়া পড়ে ইফতার করাঃ

اللهم لك صمت وتوكلت على رزقك وافطرت برحمتك ياألرحم الرحمين…

ইফতারের দোয়ার বাংলা উচ্চারন:

আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া তাওয়াক্কালতু আ’লা রিজক্বিকা ওয়া আফতারতু বি রাহমাতিকা ইয়া আর্ হামার রা-হিমীন।

ইফতারের বাংলা দোয়া:

হে আল্লাহ তায়ালা আমি আপনার নির্দেশিত মাহে রমাজানের ফরয রোজা শেষে আপনারই নির্দেশিত আইন মেনেই রোজার পরিসমাপ্তি করছি ও রহমতের আশা নিয়ে ইফতার আরম্ভ করিতেছি। তারপর “বিসমিল্লাহি ওয়া’আলা বারাকাতিল্লাহ” বলে ইফতার করিবেন।

ইফতারের পর আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে দোয়া পড়া

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন-

ذَهَبَ الظَّمَاءُ وَابْتَلَتِ الْعُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الْأَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ

উচ্চারণ : ‘জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতালাতিল উ’রুকু; ওয়া ছাবাতাল আঝরূ ইনশাআল্লাহ।’

অর্থ : ‘ (ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো ‘ (আবু দাউদ, মিশকাত)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সাহরির পর নিয়ত করা, ইফতারের আগে তাওবা-ইসতেগফার করা, ইফতারের সময় দোয়া পড়া এবং ইফতারের পর শোকরিয়া আদায় করে দোয়া পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যথা সময়ে ইফতার করাঃ

“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

রাসূল (স.) বলেন: লোকেরা ততক্ষণ কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ তারা ইফতার জলদি করবে। (বুখারী, মুসলিম ১ খণ্ড-৩২১ পৃঃ মিশকাত ১৭৫ পৃঃ)

হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই বান্দা যে ইফতার সঠিক সময়ে করে। (তিরমিযী ১ম খণ্ড, ৮৮ পৃঃ, মেশকাত ১৭৫ পৃঃ) ।

যদি কেউ ইচ্ছা করে ইফতারে দেরী করে তাহলে সে রসূলুল্লাহ (স.) এর নির্দেশ অনুযায়ী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহর নিকট অপ্রিয় হবে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।

আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফ (রা.) বলেন, একবার আমরা (রমজানে) আল্লাহর রসূল (স.) এর সাথে সফরে ছিলাম (তখন তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন) অতঃপর (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) তিনি একজন সাহাবীকে বললেন, নামো এবং আমার জন্য ছাতু গুলে দাও।

সাহাবী (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) লালিমা দেখে বলল, হে আল্লাহর রসূল (স.) ঐ যে সূর্য (দেখা যায়) তিনি (তাঁর কথায় কান না দিয়ে) আবার বললেন, তুমি নামো এবং আমার জন্য ছাতু গোল। এভাবে তিন বার বললেন। অতঃপর তিনি (বেলাল রা.) নামলেন এবং রসূলুল্লাহ (স.) এর জন্য ছাতু গুললেন। তিনি তা পান করলেন। তারপর তিনি পূর্ব দিকে ইশারা করে বললেন, যখন তোমরা দেখবে যে, রাত ঐ দিক থেকে আসছে তখন বুঝবে সিয়াম পালনকারীর ইফতারের সময় হয়ে গেছে (বুখারী ২৬০ পৃঃ মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৫১ পৃঃ)।

এ হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, ইফতারের নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরী করা মোটেই উচিত নয়। যদি কেউ ইচ্ছা করে ইফতারে দেরি করে তাহলে সে রসূলুল্লাহ (স.) এর নির্দেশ অনুযায়ী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহর নিকট অপ্রিয় হবে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।

ইফতারের মাসায়েলঃ

“”””””””””””””””””””””””””””””””

সূর্যাস্ত হয়ে যাওয়ার পর তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৩)

খেজুর দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব। তারপর কোনো মিষ্টি জিনিস দ্বারা। তারপর পানি দ্বারা। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৫)

ইফতারের সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়া : বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজিককা আফ্তারতু।

ইফতারের পর নিম্নোক্ত দোয়া পড়া : জাহাবাজ্-জামাউ, ওয়াব্ তাল্লাতিল উরুকু, ওয়া ছাবাতাল আজ্রু, ইন্শাআল্লাহু তাআলা।

বৃষ্টির দিনে কিছু দেরি করে ইফতার করা উত্তম। শুধু ঘড়ি বা আজানের ওপর নির্ভর করা ভালো নয়। কারণ এতে ভুল হতে পারে। (ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়াহ : খ. ৩, পৃ. ১০৮; মাসায়েল রমাজান, রাফয়াত কাছেমি : পৃ. ১৯৭)

ইফতারের জন্য মাগরিবের নামাজ পাঁচ-ছয় মিনিট বিলম্বে আদায় করার অবকাশ আছে। (রহিমিয়া : খ. ১, পৃ. ৩৭)

যদি সূর্যাস্তে সন্দেহ হয়, তাহলে ইফতার করা হালাল হবে না। (নাওয়াজিল : পৃ. ১৫২, শামি : খ. ৩, পৃ. ৩৮৩)

পশ্চিম দিকে প্লেনে সফর করার কারণে যদি দিন বড় হয়ে যায়, তাহলে সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সূর্যাস্ত হলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইফতার বিলম্ব করতে হবে। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও সূর্যাস্ত না হলে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার সামান্য কিছু আগে ইফতার করে নেবে। (আহসানুল ফাতাওয়া : খ. ৪, পৃ. ৭০)

‘লবণ দ্বারা ইফতার শুরু করা উত্তম’—এরূপ আকিদা ভুল। (আহকামে জিন্দেগি : পৃ. ২৪৭)

আল্লাহ আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন।

তারাবীহ নামাজের ফজিলত ও গুরুত্বঃ

:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

পবিত্র রমজান মাস খায়ের ও বরকতের বসন্তকাল। রমজানের দিনে রোযা রাখাকে আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবানে রাতের “কিয়াম” যাকে কিয়ামে রমযান বা তারাবী বলে, সুন্নত বানিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

من قام رمضان ايمانا و احتسابا غفرله ماتقدم من ذنبه

অনুবাদ: যে ব্যক্তি ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে পরকালীন প্রতিদান কামনায় রমযান মাসের রাতে কিয়াম করবে(তারাবী পড়বে ইমাম নববী রহ: মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন) তার অতীত জীবনের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখরী শরীফ ও মুসলিম)

তবে বিভিন্ন জনমতের কারণে তারাবীর নামাযকে সুন্নতে মুয়াক্কাদাই রাখা হয়েছে, ফরজ করা হয়নি, কিন্তু এতে সন্দেহ নেই যে রমযানের উপকারিতা ও খায়ের বরকত পূর্ণরূপে লাভ করতে হলে তারাবী নামায পড়া জরুরী। তারাবী নামায পড়ার দ্বারা রমযান ও কুরআনের হক আদায় হবে, রোযার উদ্দেশ্য তাকওয়া হাসিলে সাহায্য পাওয়া যাবে,আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত, সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে। তাই আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের জন্য উচিৎ তারাবীর প্রতি উদগ্রীব হয়ে থাকে ।

তারাবীর গুরুত্ব এ থেকে ও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সুন্নত ও নফলের সাধারণ নিয়মে জামাআত নিষিদ্ধ, অথচ তারাবী নামাযের জামাআত বিধিবদ্দ হয়েছে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জামাআতের ব্যবস্থা এজন্যই করেননি যে, তা আবার উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যায় কি না। এ থেকে বোঝা যায়, তারাবীর মাকাম -মর্যাদা সাধারণ নফল নামায থেকে অনেক উর্দ্ধে। মোট কথা অনেক দলীলের ভিত্তিতে ফকীহগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তারাবীর নামায অন্য সব নফলের মত নয়, বরং এটা না পড়লে গুনাহ হবে। এর বিপক্ষের মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় প্রভাবান্নিত হয়ে নিজেকে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না। রমযানের রাতগুলোকে মহাসুযোগ মনে করে গুরুত্বের সাথে তারাবীর নামাযে যত্নবান থাকুন এবং শেষ রাতে ” তাহাজ্জুদ নামাযের ব্যপারে (যা সারা বছরের নামায) যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করুন।

★★এ বিষয়টি ৪ টি ধারায় বর্ননা করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

১/ তারাবীহ সালাত কি ও কেন?

২/ তারাবীহ এর হুকুম ও পদ্ধতি?

৩/ তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা?

৪/ মতোভেদ নিরসন ও সমাধান?

# তারাবীহ সালাত কি ও কেনঃ

** তারাবীহ সালাত হলো রামাদ্বান মাসের রাত্রে এক বিশেষ ধরনের নফল/সুন্নাত সালাত যা অনেক ফজিলতপূর্ন, বরকতময়, কিন্তু এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, যোদি কেউ কারন বসত এই সালাত ত্যাগ করেন তাহলে উনার গুনাহ হবেনা, তা সত্বেও এই সালাত আদায় করার মাধ্যমে অনেক ফজিলত ও সোয়াব হাসিল করা যায়,, অনেক উলামায় কেরাম তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ কে একি সালাত হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন, যোদিও তাহাজ্জুদ ও তারাবীহ উভয় ই কিয়ামুল লাইল (রাতের সালাত) এর অন্তর্ভুক্ত হাদিসের মতনের মধ্যে তারাবীহ শব্দটি আসেনি তবু রামাদ্বান মাসের কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ) সারা বছরের কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) অপেক্ষা বেশি মর্যাদা রাখে,, নিচে উল্লেখ করা হাদিসের মাধ্যমে আমরা ইনশাআল্লাহ তারাবীহ ও তারাবীহ’র ফজিলত সম্পর্কীয় ধারনা পাবো ইনশাআল্লাহ।

** সুনানে ইবনে মাজাহ

(كتاب إقامة الصلاة والسنة)

হাদিস নম্বরঃ ১৩২৬

بَاب مَا جَاءَ فِي قِيَامِ شَهْرِ رَمَضَان

َরমাযান মাসের কিয়ামুল লাইল

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بِشْرٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرٍو، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَقَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏ ‏.‏

** আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমযান মাসের সওম রাখে (এবং রাতে) দন্ডায়মান হয় (সালাত (নামায/নামাজ) পড়ে) তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করা হয়।

তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: বুখারী ৩৫, ৩৭-৩৮, ১৯০১, ২০০৮-৯, ২০১৪; মুসলিম ৭৫১-২, ৭৬০/১-২; তিরমিযী ৬৮৩, ৮০৮; নাসায়ী ১৬০২-৩, ২১৯৪, ২১৯৬-০৭, ৫০২৪-২৭; আবূ দাঊদ ১৩৭১-৭২, আহমাদ ৭১৩০, ৭২৩৮, ৭৭২৯, ৭৮২১, ৮৭৭৫, ৯১৮২, ৯৭৬৭, ৯৯৩১, ১০১৫৯, ১০৪৬২, ২৭৫৮৩, ২৭৬৭৫; মুওয়াত্ত্বা মালিক ২৫১, দারিমী ১৭৭৬, ইবনু মাজাহ ১৬৪১।

উল্লেখ্য হাদিসের মাধ্যমে তারাবীহ কি ও কেন উভয় প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই আল্লাহ পাক রাব্বুল ইজ্জাত এই ফজিলত হাসিল করার তাওফিক দান করুন আমাদের সবাইকে।

 

#তারাবীহ এর হুকুম পদ্ধতিঃ

 

** তারাবীহ সালাত সুন্নাতে মুয়াকাদ্দা, এই সালাত ফরজ বা ওয়াজিব নয়, রাসুল (সঃ) এই সালাত সুন্নাত বোঝানোর জন্য এবং ফরজ হয়ে যাওয়ার আসংকায় মাঝে মধ্যে ইচ্ছা করে এই সালাত ছেড়েছেন, নিচের উল্লেখিত হাদিসের মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ আমরা বুঝতে পারবো।

** সহীহ বুখারী

(كتاب صلاة التراويح)

হাদিস নম্বরঃ ২০১২

بَاب فَضْلِ مَنْ قَامَ رَمَضَان

কিয়ামে রমাযান-এর (রমাযানে তারাবীহর সলাতের) গুরুত্ব।

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ عُقَيْلٍ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ أَنَّ عَائِشَةَ أَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ لَيْلَةً مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ فَصَلَّى فِي الْمَسْجِدِ وَصَلَّى رِجَالٌ بِصَلاَتِهِ فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا فَاجْتَمَعَ أَكْثَرُ مِنْهُمْ فَصَلَّى فَصَلَّوْا مَعَهُ فَأَصْبَحَ النَّاسُ فَتَحَدَّثُوا فَكَثُرَ أَهْلُ الْمَسْجِدِ مِنْ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلَّى فَصَلَّوْا بِصَلاَتِهِ فَلَمَّا كَانَتْ اللَّيْلَةُ الرَّابِعَةُ عَجَزَ الْمَسْجِدُ عَنْ أَهْلِهِ حَتَّى خَرَجَ لِصَلاَةِ الصُّبْحِ فَلَمَّا قَضَى الْفَجْرَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَتَشَهَّدَ ثُمَّ قَالَ أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّهُ لَمْ يَخْفَ عَلَيَّ مَكَانُكُمْ وَلَكِنِّي خَشِيتُ أَنْ تُفْتَرَضَ عَلَيْكُمْ فَتَعْجِزُوا عَنْهَا فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَالأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ

‘** আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর রাতে বের হয়ে মসজিদে সালাত আদায় করেন, কিছু সংখ্যক পুরুষ তাঁর পিছনে সালাত আদায় করেন। সকালে লোকেরা এ সম্পর্কে আলোচনা করেন, ফলে লোকেরা অধিক সংখ্যায় সমবেত হন। তিনি সালাত আদায় করেন এবং লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করেন। সকালে তাঁরা এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। তৃতীয় রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে সালাত আদায় করেন ও লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করেন। চতুর্থ রাতে মসজিদে মুসল্লীর সংকুলান হল না, কিন্তু তিনি রাতে আর বের না হয়ে ফজরের সালাতে বেরিয়ে আসলেন এবং সালাত শেষে লোকদের দিকে ফিরে প্রথমে তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার পর বললেনঃ শোন! তোমাদের (গতরাতের) অবস্থান আমার অজানা ছিল না, কিন্তু আমি এই সালাত তোমাদের উপর ফরজ হয়ে যাবার আশংকা করছি (বিধায় বের হই নাই)। কেননা তোমরা তা আদায় করায় অপারগ হয়ে পড়তে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাত হলো আর ব্যাপারটি এভাবেই থেকে যায়।

** রাসুল (সঃ) এর ওফাত হলো আর এ ব্যপারটি এভাবেই থেকে যায়,,, কথাটি বলার কারন হলো যে হাদিসে উল্লেখিত পদ্ধতিতে ই সালাত আদায় করার প্রচলন ছিলো তথা মসজিদে বা ঘরে কখনো জামাতে বা কখনো একা, উমর রাঃ এর খেলাফতের শেষের দিকে জামাতকে নির্দিষ্ট করা হয়, এ বিষয় একটি হাদিস উল্লেখ করে সহজ করার চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ।

**সহীহ বুখারী

(كتاب صلاة التراويح)

হাদিস নম্বরঃ ২০১০

بَاب فَضْلِ مَنْ قَامَ رَمَضَان

কিয়ামে রমাযান-এর (রমাযানে তারাবীহর সলাতের) গুরুত্ব।

وَعَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ بْنِ عَبْدٍ الْقَارِيِّ أَنَّهُ قَالَ خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلاَتِهِ الرَّهْطُ فَقَالَ عُمَرُ إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلاَءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاَةِ قَارِئِهِمْ قَالَ عُمَرُ نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِي يَقُومُونَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ

** ‘আবদুর রাহমান ইবনু ‘আবদ আল-ক্বারী (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রমাযানের এক রাতে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর সাথে মসজিদে নাবাবীতে গিয়ে দেখি যে, লোকেরা এলোমেলোভাবে জামা‘আতে বিভক্ত। কেউ একাকী সালাত আদায় করছে আবার কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং ইকতেদা করে একদল লোক সালাত আদায় করছে। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে জমা করে দেই, তবে তা উত্তম হবে। এরপর তিনি ‘উবাই ইবনু ‘কাব (রাঃ)-এর পিছনে সকলকে জমা করে দিলেন। পরে আর এক রাতে আমি তাঁর [‘উমার (রাঃ)] সাথে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। ‘উমার (রাঃ) বললেন, কত না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা! তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত।

= সুতরাং তারাবীহ সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, এবং এর জামাত একটি মুস্তাহাব বিষয় এটি পরিষ্কার,, আর এর আদায় পদ্ধতি হলো নিচে বর্নিত হাদিসের পদ্ধতি মুতাবেক ,।

** সহীহ বুখারী

(كتاب الوتر)

হাদিস নম্বরঃ ৯৯০

بَاب مَا جَاءَ فِي الْوِتْر

বিতরের বর্ণনা।

عَبْدُ اللهِ بْنُ يُوسُفَ قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ عَنْ نَافِعٍ وَعَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ صَلاَةِ اللَّيْلِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَيْهِ السَّلاَم صَلاَةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمْ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى.

** ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাতের সালাত দু’ দু’ (রাক‘আত) করে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হবার আশঙ্কা করে, সে যেন এক রাক‘আত সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করল, তা তার জন্য বিতর হয়ে যাবে।

= আশাকরি এই হাদিসের মাধ্যমে আমরা কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ) সালাত আদায়ের প্রাথমিক ধারনা পেয়েছি, এখন কথা হলো সমস্ত বছরের কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) এর থেকে রামাদ্বান মাসের কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ) এর পার্থক্য হলো, এই বিশেষ সালাতে প্রতি চার রাকাত অন্তর তারবিহাত (বিশ্রাম) নেয়া এই সালাতের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট, যার দলিল রাকাতের দলিল পেশ করার বেলায় উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।

আশাকরি তারাবীহ’র হুকুম ও পদ্ধতি সম্পর্কীয় ধারনা উল্লিখিত দলিলের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পেরেছি,

#তারাবীহ’র রাকাত সংখ্যাঃ

** এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের সমাজে তারাবীহ রাকাত সংখ্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত ঝগড়া, বিবাধ, ও নিন্দা করতে দেখা যায়, আর সবচেয়ে বেশি মুসিবতে পড়েন সমাজের সাধারণ লোকজন, একেক আলেম একেক ধরনের কথা বলেন এখন আমরা কুন দিকে যাবো এই প্রশ্ন বাড়ে বাড়ে ভেসে আসে, ইনশাআল্লাহ চতুর্থ ভাগে এর নিরসন এর চেষ্টা করবো।

وما توفیق الا بالله

=*= উল্লেখ যোগ্য রাকাত সমূহ ও তার দলিল।

® ৮ রাকাত তারাবীহ এর দলিলঃ

সহিহ বুখারী

كتاب صلاة التراويح)

হাদিস নম্বরঃ ২০১৩

তিরমিযি

হাদিস নম্বরঃ ৪৩৯

بَاب فَضْلِ مَنْ قَامَ رَمَضَان

কিয়ামে রমাযান-এর (রমাযানে তারাবীহর সলাতের) গুরুত্ব।

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللهِ فِي رَمَضَانَ فَقَالَتْ مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَتَنَامُ قَبْلَ أَنْ تُوتِرَ قَالَ يَا عَائِشَةُ إِنَّ عَيْنَيَّ تَنَامَانِ وَلاَ يَنَامُ قَلْبِي

আবূ সালামাহ ইবনু ‘আবদুর রাহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করেন যে, রমাযানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত কিরূপ ছিল? তিনি বললেন, রমাযান মাসে ও রমাযানে ব্যতীত অন্য সময়ে (রাতে) তিনি এগার রাক‘আত হতে বৃদ্ধি করতেন না।তিনি চার রাক‘আত সালাত আদায় করতেন, তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। এরপর তিন রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। আমি ‘আয়িশাহ (রাযি.) বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বিতর আদায়ের আগে ঘুমিয়ে যাবেন? তিনি বললেনঃ হে ‘আয়িশাহ্! আমার দু’চোখ ঘুমায় বটে কিন্তু আমার কালব নিদ্রাভিভূত হয় না।

= উক্ত হাদিসের মাধ্যমে ৮ রাকাত তারাবীহ ও ৩ রাকাত বিতির এর দলিল পাওয়া যায়,, হাদিস সহিহ

® ১০ রাকাত তারাবীহ এর দলিলঃ

বুলুগুল মারাম

(كتاب الصلاة)

হাদিস নম্বরঃ ৩৭৭

وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا عَنْهَا: كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ عَشْرَ رَكَعَاتٍ, وَيُوتِرُ بِسَجْدَةٍ, وَيَرْكَعُ رَكْعَتَيْ الْفَجْرِ, فَتِلْكَ ثَلَاثُ عَشْرَةَ – صحيح. رواه البخاري

উক্ত কিতাবদ্বয়ে (বুখারী ও মুসলিমে) উক্ত রাবী বর্ণিত ভিন্ন এক হাদীসে রয়েছে: তিনি রাতে ১০ রাক’আত তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতেন, আর ১ রাক’আত বিতর আদায় করতেন, তারপর ফজরের দু’রাক’আত সুন্নাত আদায় করতেন, এভাবে মোট তের রাক’আত সালাত হতো।[1]

[1] বুখারী ৬২৬, ৯৯৪, ১১২৩, ১১৪০, মুসলিম ৭২৪, ৭৩৬, ৭৩৭, তিরমিযী ৪৩৯, ৪৪০, নাসায়ী ৬৮৫, ১৬৯৬ আবূ দাউদ ১২৫৪, ১২৫৫, ইবনু মাজাহ ১১৯৮, ১৩৫৮, আহমাদ ২৩৫৩৭, ২৩৫৫৩, মুসলিম ২৪৩, ২৬৪, দারেমী ১৪৭৩, ১৪৭৪।

= উক্ত হাদিসের মাধ্যমে ১০ রাকাত তারাবীহ ও ১ রাকাত বিতির সালাতের দলিল পাওয়া যায়। হাদিস সহিহ।

® ২০ রাকাত তারাবীহ এর দলিলঃ

নাস্বুর রায়া- লিআহাদীসে হিদায়া ২য় খন্ড, ৯৯ পৃষ্ঠা

أخبرنا أبو طاهر الفقيه حدثنا أبو عثمان البصري حدثنا أبو أحمد محمد بن عبد الوهاب حدثنا خالد بن مخلد حدثنا محمد بن جعفر حدثني يزيد بن خصيفة عن السائب بن يزيد قال : كنا نقوم في زمن عمر بن الخطاب بعشرين ركعة والوتر

সায়িব বিন ইয়াযীদ

বলেন, আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর সময় ২০ রাক‘আত তারাবীহ ও বিতর পড়তাম।

= উল্লেখিত হাদিসের মাধ্যমে ২০ রাকাত তারাবীহ সালাতের দলিল পাওয়া যায়, হাদিস সহিহ।

এখন কথা হলো তারাবীহ কে কেন্দ্র করে ৩ ধরনের রাকাত প্রসিদ্ধ ভাবে সহিহ আল ইসনাদ হাদিসের মাধ্যমে উল্লেখ আছে, এখন আমরা এর কত সংখ্যাকে গ্রহন করবো আর কোন হাদিসের রাকাতকে গ্রহন করবোনা এবং কেন ই বা সেই সহিহ হাদিসের রাকাত সংখ্যাকে ত্যাগ করবো??? ,,, এই সংশয় দূর করার জন্য ই নিরসন ও সমাধান পর্ব অর্থাৎ চতুর্থ পর্ব ইনশাআল্লাহ চেষ্টা করবো যথাসাধ্য সুন্দর ও সহজ সমাধান খুজার এবং সমস্ত সহিহ হাদিসকে মূল্যায়ন করার।وما توفیق الا بالله

রাসুল সাঃ ও আবু বকর রা: এর যুগে তারাবীহ্ঃ

পবিত্র রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবীর নামায পড়েছেন, এ ব্যপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু কত রাকাআত পড়েছেন, এ ব্যপারে তালাশ করলে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তার মাঝে তিনটি বর্ণনা প্রশিদ্ধ।পর্যায়ক্রমে তাহলো,হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত হাদীস, হযরত আয়েশা রা. . বর্ণিত হাদীস, হযরত জাবের রা. বর্ণিত হাদীস ।

(১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত,তিনি বলেনঃ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ২০ রাকাআত তারাবী ও বিতর পড়তেন।

(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ২য় খন্ড, ৩৯৪ পৃ; ৭৭৭৪ আসসুনানুল কুবরা বায়হাকী-২য় খন্ড ৪৯৬ পৃষ্ঠা)

এর মাঝে হযরত আয়শা রা: ও হযরত জাবের বর্ণিত হাদীস দু’খানা সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ। এখন আমরা হযরত ইবনে আব্বাস রা: কতৃক বর্ণিত হাদীস সস্পর্কে আলোচনা করছি। হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানী রহ: বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই দুই দিন জামাআতের সাথে তারাবীর ইমামতি করেছিলেন সেই দুই দিন বিশ রাকাআত নামায পড়েছিলেন। (আত্তালখিসুল হাবীর: ১ম খন্ড ১১৯ পৃষ্ঠা)

উক্ত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ রাকাআত তারাবী পড়েছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধারাবাহিক এই আমলের প্রচলন করেননি, কেননা তার আশংকা ছিল যে, ধারাবাহিক করলে আল্লাহ তাআলা যদি এই আমলকে ফরজ করে দেন? তাই তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিশ রাকাআত বা জামাতের সাথে না পড়ে সাহাবায়ে কেরামের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে দুই, তিন জন বা একাকা তারা তারাবী পড়তে লাগলেন এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র জমানা শেষ হয়ে যায়। তারপর প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা: এর যুগেও এই অবস্থাই ছিল। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করে এ ব্যাপারে নিয়মতান্ত্রিক কিছু করেননি। তাছাড়া তার খেলাফতের সময়টা তো অধিকাংশ কেটেছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা বিভিন্ন নব্য বাতিল ফেরকাকে স্তমিত করার ক্ষেত্রে। যুগ চলল সামনের দিকে , হযরত উমর রা: এর খেলাফত কালের শুরু কয়েকটি বছর সেই ধারাবাহিকতাই কেটে গেল। এর দ্বারা বুঝাগেল তারাবী নামাযের রাকাআত সংখ্যা বিশরাকাআত।

হযরত উমর রা:, আনসার ও মুহাজির সাহাবীদের আমল

আমাদের দেখতে হবে যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ সাহচার্য গ্রহণ করে যারা দ্বীন শিখেছেন। সে সব সাহাবীদের আমল কেমন ছিল। তাদের অনুসৃত পথই সুস্পষ্ট করে দিবে যে এটাই তো রাসূলের পথ। কেননা জেনে শুনে কখনোই তাঁরা রাসূলের পথের বিপরীদ কোন আমল করেননি। এবং কাউকে করতে দেখলে তারা চুপ করেও বসে থাকেননি।

সুতরাং কোন ব্যপারে সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমত পোষন করার অর্থই হবে যে এর বিপরীদ পথ কখনোই রাসূলের পথ নয়। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

عليكم بسنتي ، و سنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي ، تمسكوا بها ، و عضوا عليها بالنواجذ،

আমার স্ন্নুত ও আমার হেদায়াত প্রাপ্ত খলীফাগনের সুন্নতকে আকড়ে রাখবে। একে আবলম্বন করব এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে প্রানপন করে কামড়ে রাখবে।

(সুনানে আবু দাউদ হাদীস: ৪৬০৭ , জামে তিরমিযী হাদীস: ২৬৭৬)

রাসূলের উক্ত হিদায়েত মুতাবিক আমরা তালাশ করে দেখি, তারাবীর নামাযের রাকাআতের সংখ্যার ব্যপারে তাদের থেকে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় কি না।

হযরত আব্দুর রহমান আলক্বারী রহ: বলেন, আমি রমযান মাসে একদা হযরত উমর রা: এর সঙ্গে “মসজিদে গেলাম, তখন দেখলাম লোকজন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারাবী নামায পড়ছেন। কেউ একা পড়ছেন আবার কেউ দু চার জন সঙ্গে নিয়ে পড়ছেন। তখন হযরত উমর রা: বললেন তাদের সবাইকে যদি এক ইমামের পেছনে জামাআত বদ্ধ করে দেই তাহলে মনে হয় উত্তম হবে। এর পর তিনি তাদেরকে হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা: এর পেছনে এক জামাআতবদ্ধ করে দিলেন।

(বুখারী শরীফ ২য় খন্ড, ২০১০পৃষ্ঠা, মুয়াত্তা মালেক ১খন্ড, ১১৪পৃষ্ঠা)

হযরত ওমর রা: এর উক্ত সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ইবনে আব্দুল বার রহ;: তার বিখ্যাত গ্রন্থ আত তামহীদ এ লিখেন, হযরত উমর রা এখানে নতুন কিছুই করেননি। তিনি তাই করেছেন যা খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করতেন। কিন্তু তিনি শুধু এই আশঙ্কায় যে নিয়মিত জামাআতে পড়লে উম্মতের উপর তারাবীর নামায ফরজ হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি নিজে জামাআতের ব্যবস্থা করেননি। উমর রা: বিষয়টি ভালোভাবে জানতেন। তিনি দেখলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর ওহী বন্ধ হয়েগেছে। সুতরাং তারাবীর নামায ফরজ হওয়ার এখন আর আশঙ্কা নেই। তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পছন্দ অনুযায়ী ১৪ হিজরীতে জামাআতে পড়ার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ তাআলা যেন এই মর্যাদা ও সুযোগ তার জন্যই রেখে দিয়েছিলেন। (আততামহীদ ৮ম খন্ড, ১০৮-১০৯ পৃষ্ঠা)

হযরত উমর রা: এর সুচিন্তিত রায় ও উপস্থিত সাহাবাদের সম্মতিক্রমে বিশ রাকাআত তারাবীর ধারাবাহিক আমল এর বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

১. হযরত ইয়াযিদ ইবনে খুসাইফা রা: থেকে হযরত সায়েব ইবন ইয়াযীদ বলেন: তারা (সাহাবা ও তাবেয়ীন) উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে রমযান মাসে ২০ রাকাআত তারাবী পড়তেন । তিনি আরও বলেন যে, তারা নামাযে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সুরা সমূহ পড়তেন এবং উসমান ইবনে আফফান রা. এর যুগে দীর্ঘ নামাজের কারণে তাদের কেউ কেউ লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতেন।

(আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী-২/৪৯৬)

২. সাহাবী হযরত সায়েব ইবনে ইয়াযীদ রা. এর অন্য আরেকটি বিবরণ হল: আমরা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে বিশ রাকাআত এবং বিতর পড়তাম। (আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী-১খন্ড,২৬৭-২৬৮পৃ:)

৩. তাবেয়ী আব্দুল আযিয ইবনে রুফাই রহ. এর বিবরণ: হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা. রমযান মাসে মদীনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত তারাবী এবং তিন রাকাআত বিতর পড়তেন।

(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ২খন্ড, ২৮৫পৃ:)

মোট কথা উপরোক্ত বর্ণনা এবং এ ধরণের অন্যান্য সহীহ বর্ণনার ভিত্তিতে এবং সাহাবা ও তাবেয়ীনের যুগ থেকে চলে আসা সম্মিলিতও অবিচ্ছিন্ন কর্মের ভিত্তিতে আলেম গণের সর্বসম্মতি বয়ান হল এই যে, হযরত উমর রা: এর যুগে মসজিদে নববীতে বিশ রাকআত তারাবী হত।

এ ব্যপারে শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ: বলেছেন: এ বিষয়টি প্রমানিত যে, উবাই ইবনে কা’ব রমজানে তারবীতে মুসল্লিদের কে বিশ রাকআত পড়াতেন এবং তিন রাকআত বিতর পড়াতেন। (মাজমূউল ফাতাওয়া: ১৩তম খন্ড,১১২-১১৩ পৃষ্ঠা)

৪.বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম আবু আব্দুর রহমান আসসুলামী রহ: বলেন: হযরত আলী রা: রমযানে কারীগণকে ডেকে একজনকে আদেশ করেন যে, তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকআত পড়েন ।

(আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী ১খন্ড, ৪৯৬,৪৯৭ পৃষ্টা)

উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্ট হচ্ছে যে, হযরত উমর , রা: হযরত উসমান রা: এবং হযরত আলী রা: এর খেলাফত কালে জামাআতের সাথে প্রকাশ্যে বিশ রাকাআত তারাবী নামায পড়া হত। এবং এই সোলানী যুগে বিশ রাকাআত তারাবীর আমল সাবীলূল মুমিনীন- মুমিনদের সকলের অনুসৃত পথ। বর্তমান যারা যারা বিশ রাকআত তারাবীর উপর আপত্তি করে এবং সুন্নাহ বা হাদীসের খেলাফ বলে তারা মূলত সাবীলুল মুমিনীন থেকে বিচ্যুতিই গ্র্রহন করে নিয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হল, মসজিদে নববীতে ১৪ হিজরী থেকেই হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা: এর ইমামতিতে প্রকাশ্যে বিশ রাকআত তারাবী পড়া হত। প্রশ্ন হল, সেই সময় মুসল্লী ও মুুক্তাদী হতেন কারা? এই মুহাজির ও আনসারী সাহাবীগনই সেই মুবারক জামাতের মুক্তাদী ও মুসল্লী ছিলেন। শীর্ষ স্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম যাদের থেকে অন্যান্য সাহাবী দ্বীন শিখতেন যারা কুরআনের শিক্ষা, হাদীস বর্ণনা ও ফিকহ-ফতওয়ার স্তম্ভ ছিলেন তাদের অধিকাংশই তখন মদীনায় ছিলেন। দুই একজন যারা মদীনার বাইরে ছিলেন তারাও মক্কা মদীনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং খলিফায়ে রাশেদের কর্ম সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ওয়াকেফ হাল থাকতেন, তাদের একজনও কি বিশ রাকাআত তারাবীর বিপক্ষে কোন আপত্তি করেছেন? তাই তো আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রহ: আলইস্তিযকার কিতাবে বলেন, এটাই হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা: থেকে বিশুদ্ধ রূপে প্রমাণিত এবং এতে সাহাবীগণের কোন ভিন্নমত নেই ।

(আল ইসতিযকার ৫ম খন্ড, ১৫৭ পৃষ্ঠা)

শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেন: এটা প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কা’ব রা: রমযানের তারাবীতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত পড়তেন এবং তিন রাকাআত বিতির পড়তেন। তাই অধিকাংশ আলেম এই সিন্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে এটাই সুন্নত। কেননা উবাই ইবনে কা’ব রা: মুহাজির ও আনসারী সাহাবাগনের উপস্থিতিতেই বিশ রাকাআত পড়িয়েছেন এবং কোন একজন সাহাবীও তাতে আপত্তি করেননি। সেই হযরত উমর রাযি এর যুগ থেকে অদ্যবধি মক্কা ও মদিনার দুই হারাম শরিফে ২০রাকাআত তারাবীহ’র নামাজ বা জামাতে আদায়ের প্রচলন হয়ে আসছে।

(মাজমুউল ফাতওয়া, ইবনে তাইমিয়া: ২৩ খন্ড, ১১২,১১৩ পৃষ্ঠা)

وما تو فيقي الا بالله عليه توكلت وهو رب العرش العظيم

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here