করোনার প্রভাবে দেশে গরিব আড়াই কোটি

14
Spread the love

মহামারী করোনার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দেশে এখনো প্রায় আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র তালিকায় রয়ে গেছে। সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমে গিয়ে আরও বেশি ঋণে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এদের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহুরে বস্তিবাসীদের অবস্থা ভয়াবহ। দেশে করোনা সংক্রমণের এক বছরে দরিদ্ররা এখনো তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে লড়াই করছে। গত বছরের জুনের তুলনায় নতুন দরিদ্রদের সংখ্যা কমলেও এখনো তা অবাক হওয়ার মতো সংখ্যায় রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপের ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘পোভার্টি ডায়নামিকস অ্যান্ড হাউসহোল্ড রিয়েলিটিস’ শীর্ষক এই জরিপের (শেষ পর্ব) ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন।

জরিপের ফল অনুযায়ী, গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে নতুন করে দরিদ্রদের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যার ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ ছিল নতুন দরিদ্রদের সংখ্যা, যা চলতি বছরের মার্চে এসে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে। এর ফলে মহামারী করোনার আঘাতে এখনো দেশের ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন দারিদ্র্যের তালিকায় রয়েছে। মহামারী এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও বর্তমানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। জরিপের ফল অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ।

অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যেমন চরম ও মধ্যপন্থি দরিদ্র, যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে এবং দুর্বল দরিদ্র বা ভালনারেবল নন-পুওরভিএনপি (যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার ওপরেই বসবাস করেন, কিন্তু যেকোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন), দারিদ্র্যসীমার ওপরে কিন্তু মধ্যম জাতীয় আয়ের নিচে থাকা গ্রুপগুলোর পারিবারিক আয় সবচেয়ে ধীর হয়ে উঠেছে । সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত জুনে আর্থিক অবস্থা ভঙ্গুর বা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা গোষ্ঠীগুলোর ৭২ শতাংশের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, যারা তখন নতুন দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এ ধরনের গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন দরিদ্রের পরিমাণ বর্তমানে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।

মহামারীর প্রভাবে নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চের মধ্যে তিন ধাপে টেলিফোনিক সমীক্ষা চালিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। নিম্ন আয়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের করোনা মোকাবিলায় অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে ২০২০ সালের এপ্রিলে সমীক্ষার প্রথম পর্যায়টি পরিচালনা করা হয়। একই বছরের জুন-জুলাইয়ে জরিপের দ্বিতীয় ধাপে কভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাবের ধরন এবং পুনরুদ্ধারের উপায় নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়।

চলতি বছরের মার্চ মাসে গ্রাম ও শহরের বসবাসকারী ৬ হাজার ৯৯টি পরিবারের ওপর পিপিআরসি এবং বিআইজিডি তাদের তৃতীয় সমীক্ষাটি করেছে। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার ওপরেই বসবাস করেন, কিন্তু যেকোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। এ হিসাব থেকে জাতীয় পরিসরে নতুন দরিদ্রের এ হিসাব (১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ) প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে গত জুনের তুলনায় এ ধরনের দরিদ্রদের কর্মসংস্থানে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জরিপে জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কভিডের আঘাত সব জায়গায় একইভাবে অনুভূত হয়নি। শহরের তুলনায় গ্রামে তার প্রভাব কমই দেখা গেছে। সে কারণে শহরের বস্তিবাসীর জীবন গ্রামের শ্রমজীবীদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত।

তবে দেশের কৃষি খাত অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, কেবল কৃষক ছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী বাকি সব পেশার মানুষের আয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় কমেছে। কিন্তু পুনরুদ্ধারের কথা যখন বলা হয়, তখন মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির বড় বড় খাত, যেমন তৈরি পোশাক খাতের কথাই উল্লেখ করা হয়। জাতীয় পরিসরে কৃষির কথা সেভাবে উচ্চারিত হয় না।

অনুষ্ঠানে ইমরান মতিন নারীদের কর্মহীনতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, এমনিতেই দেশের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কম, এই করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা শ্রমবাজার থেকে আরও দূরে ছিটকে পড়তে পারেন। তিনি আরও বলেন, পেশা পরিবর্তন করে দিনমজুরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গ্রহণ করায় দরিদ্রদের দুরবস্থা আরও বাড়ছে।

জরিপের তথ্য থেকে তিনি জানান, গত বছর ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বস্তিবাসী শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যান, যাদের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এখনো ফেরেনি। প্রাক-কভিড সময়ের তুলনায় শহরের বস্তিবাসীর আয় কমলেও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় গত জুনের তুলনায় এ বছরের মার্চে দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি মনে করেন, ভাড়া বাড়িতে থাকা অধিকাংশ শহুরে দরিদ্রের জন্য এটি নির্মম বাস্তবতা। সবার সঞ্চয় কমেছে আশ্চর্যজনকভাবে। অরক্ষিত অদরিদ্র এবং দরিদ্র নয় এমন শ্রেণির মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ কভিড-পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে সব শ্রেণিতেই ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার সামগ্রিকভাবে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতে বলা হয়, এক বছরে অনেক মানুষের আয়ের পতন ঘটেছে। বেড়েছে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য।

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে একরকম অচল হয়ে পড়েছে পুরো দেশ। সংক্রমণ এড়াতে একদিকে যেমন দেওয়া হচ্ছে লকডাউন ও কঠোর বিধিনিষেধ। তেমনি এমন সব ব্যবস্থাপনায় আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে অগণিত মানুষের। তাই বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষরা।

মহামারীর কারণে শহর ছেড়ে যাওয়া সবাই এখনো কর্মস্থলে ফেরেনি। করোনার প্রথম ঢেউয়ের প্রভাব কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। গত বছরের ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এখনও বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ওই সময় দেশে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়েছিল। নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সেই ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই শুরু হয় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।

সমীক্ষায় আরও বলা হয়, এসময় মহিলাদের মধ্যে কর্ম হারানোর শঙ্কা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। করোনায় বছরজুড়ে বেড়েছে ঋণের বোঝা। এসময়ে ১১ শতাংশ মানুষের সঞ্চয় কমেছে।

ফলে জীবন ও জীবিকা ঠিক রেখে ‘স্মার্ট লকডাউন’ চিন্তার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রয়োগের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এরপরও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যাকে বলা হচ্ছে সর্বাত্মক লকডাউন। এতে জরুরি পণ্য ও সেবার সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রমের বাইরের সবকিছু বন্ধ রাখা হয়েছে।

‘লকডাউন’ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়ে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। এতে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here