দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তি ও শিশুদের বিকাশ

22
Spread the love

দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তি শিশুদের বিকাশঃ

বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ।ডিজিটাল যুগ।আপনি চাইলেও এটিকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন না।যেখানেই যান,যখনই যান প্রযুক্তি ছাড়া আপনি অচল।এটি হলো আমাদের অগ্রগতির চিহ্ন।তবে এর বেশ কিছু খারাপ দিক আছে যেগুলোর কারনে আমরাই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।চাইলেও এই সমস্যার সাথে আমরা পেরে উঠছি না।তবে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করে হয়তো কিছুটা সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে শিশু কিশোরদের উপর।পরিবারের সাথে দুরত্ব,অসামাজিক আচরণ, প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি সবই প্রযুক্তির অতি ব্যবহারের ফল।আজকাল ছোট শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্কও বাদ নেই যে খাবার টেবিলে বসে মোবাইলে চোখ আটকে রেখেছে। আসলে এটা যুগের চাওয়া। হয়তো চাইলে আমরা এটাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

একসাথে সময় কাটানঃ

বর্তমানে আমাদের সমাজের চিরাচরিত একটি দৃশ্য হলো পরিবারের সদস্যরা একেক জন একেক দিকে ব্যস্ত থাকা।বাবা অফিসের কাজে ব্যস্ত হলে,মা ব্যস্ত অনলাইন ব্যবসায়।না হয় ইউটিউব থেকে বিভিন্ন রেসিপি  দেখাতেই সময়  পার করছে।বড় ভাই-বোন গুলো ব্যস্ত তাদের অনলাইন ক্লাস,কোচিং, PUBG বা Free  fire এ।একবার ভাবুন তো পরিবারের ছোট সদস্যটির কথা। তার সময় কিভাবে কাটছে?সে কার সাথে খেলছে বা কি শিখছে? সারাদিন মুখ গোঁজা করে মটু-পাতলু, Tom & Jerry,Ben10 দেখা শিশুটি থেকে আপনি দায়িত্ববোধ,আন্তরিকতা  বা সামাজিকতা আশা করতে পারেন না।যান্ত্রিক জীবন থেকে বের হয়ে বাস্তব জীবনে ফিরে আসুন। সন্তানকে সময় দিন।তার কথাগুলো শুনুন।অন্তত খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই একসাথে বসুন।কার দিন কেমন কাটলো তা জানুন।ছুটির দিনে একসাথেই না হয় Free fire খেলুন। এতে করে শিশুর মধ্যে আন্তরিকতার সৃষ্টি হবে।অন্যান্য সদস্যদের সাথে একটা Bonding তৈরি হবে।

খাবার সময় মোবাইল নয়ঃ

বর্তমান সময়ে প্রায় ৮০% মা ই খাবার খাওয়ানোর সময় বাচ্চার হাতে মোবাইল তুলে দেন।এতে করে বাচ্চা মোবাইলে নিবিষ্ট থাকে আর মা তার মুখে খাবার ঠুসতে থাকেন।বাচ্চা ঝামেলা ছাড়া অল্প সময়ে খেয়ে নিল।মাও খুশি,বাচ্চাও খুশি।এবার বলুন,আপনি বাচ্চাকে কি খাওয়ালেন বা কেন খাওয়ালেন বাচ্চা কি তা জানতে পেরেছে?মোবাইল না দিয়ে বাচ্চার সাথে গল্প করুন।তার জন্য আনা খাবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।কোন খাবার খেলে কি উপকার হয়,কোন খাবারের নাম কি তা বাচ্চার সাথে আলোচনা করুন।এতে করে সে খাবারের প্রতি আগ্রহী হবে এবং অনেক কিছু শিখতেও পারবে।

যখনতখন মোবাইল নয়ঃ

বাচ্চা কান্না করছে?মোবাইলটা দিন।

বাচ্চা খাচ্ছে না?মোবাইলটা দিন।

বাচ্চা টিভি দেখতে দিচ্ছে না?মোবাইলটা দিন।

বাচ্চা কথা বলতে দিচ্ছে না?মোবাইলটা দিন।

সব সমস্যার সমাধান কি মোবাইল?আপনার কি কিছুই করার নেই?আপনি কি মোবাইল বা ইন্টারনেট ছাড়া বড় হন নি? তাহলে এখন কেন সব সমস্যার সমাধান হিসেবে আমরা মোবাইল ব্যবহার করি?কারন আমরা সহজটা চাই।সহজটা দিয়ে যদি কাজ হয়ে যায় তাহলে কঠিন দিকে যাওয়ার দরকার কি?তবে আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছি।বাচ্চাদের ক্ষতি করছি।আপনি যখনই শিশুর সমস্যা মিটাতে মোবাইল ব্যবহার করছেন ঠিক তখনই আপনি আপনার শিশুকে একধাপ পিছিয়ে দিচ্ছেন। মনে করুন,আপনার শিশু বাইরে খেলতে যাওয়ার জন্য কান্না করছে। আপনি তার কথা না শুনে তাকে মোবাইলে ইউটিউব দিয়ে বসিয়ে দিলেন। এর ফলে যা হলো,আপনার শিশু বাইরের পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হলো,শারিরীক পরিশ্রম থেকে বঞ্চিত হলো।যেটা তার স্বাভাবিক গঠনের জন্য জরুরি ছিল।মোবাইল নিয়ে বসে থাকার ফলে তার কোন কায়িকশ্রমই হলো না।কায়িক শ্রম যদি না হয় তবে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি কি করে হবে?বসে বসে মোবাইল দেখে তার শরীরে স্থূলতা বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই হবে না।তাকে বাইরে খেলতে দিন,প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।ঘাস,বালি,পাথর,ফড়িং এসব যেন তাকে ইউটিউবে ভিডিও দেখে শিখতে না হয়।সুতরাং, সব সমস্যার  সমাধান মোবাইলে খুঁজবেন না।

বাইরের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিনঃ

মোবাইল বা ইন্টারনেট হলো একটি ভার্চুয়াল জগৎ। যেখানে সত্য মিথ্যের মিশেল থাকে। একজন শিশুর পক্ষে সত্য-মিথ্যার তফাৎ খুঁজে বের করা সম্ভব নেয়।আর কিশোর-কিশোরীরা যায় দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়ে পরে,সত্যি মনে করে।যতদিন তারা বাইরের জগতের সাথে পরিচিত হবে না ততদিন ভালো মন্দের পার্থক্যও বুঝতে পারবে না।Reality vs virtuality এ-ই দুটো জিনিস যে আলাদা তা উপলব্ধি করতে না পারলে না বাস্তব জীবনে তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়।তাই ছোট থেকেই বাইরের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।

শিশুকে বাস্তবতা শেখানঃ

আজকাল সবকিছুই অনলাইনে কিনতে পাওয়া যায়। আমাদের ব্যস্ত জীবনে অনলাইন কেনাকাটাই আমাদের ভরসা।তবে অনলাইন পণ্য গুলোর গুণগত মান বা মূল্য কি সব সময় আপনার চাওয়া অনুযায়ী হয়?নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কথাই ধরি।অনলাইনে ছবি দেখে মাছ কিনলেন। মাছ যদি ভালো না হয়,আপনি কি তা ফেরত দিতে পারছেন?না।আপনি চুপচাপ ঠকে গেছেন।এক কাজ করুন না,কোন এক ছুটির দিনে আপনার সন্তানকে নিয়ে বাজার থেকে ঘুরে আসুন।মাছের গায়ে হাত দিয়ে,কানটা উল্টে তাজা মাছটাই নিয়ে আসুন,ঢেঁড়সের আগা ভেঙে শিখিয়ে দিন কি করে চিনতে হয় তাজা ঢেঁড়স। দেখবেন আপনার সন্তান অনেকখানিই বাস্তবতা শিখে গেছে।আপনার অজান্তেই সেই হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী।

নিজেরাও সচেতন হোনঃ

বাচ্চার সামনে আপনি সারাক্ষণ ইন্টারনেটে মুখ ডুবিয়ে রাখলেন,তাকে সময় দিলেন না।মা-বাবা,ভাই-বোন সবাই আলাদা আলাদা ভাবে মোবাইল ফোনে বা ইন্টারনেটে ব্যস্ত।পরিবারের ছোট শিশুটি এটা দেখেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।বড় হতে হতে সেও পরিবারের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতকে বেশি ভালোবাসবে।তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে আপনিও সচেতন হোন।

শেষ কথা:

যেহেতু প্রযুক্তিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারিনা সেহেতু এর বিরোধিতা করাও উচিত নয়।তবে সবকিছুর একটা সীমাবদ্ধতা থাকে।এমনটা যেন না হয় যে আমরা প্রযুক্তির দাস হয়ে পরেছি।প্রযুক্তি থাকুক আমাদের হাতের মুঠোয়।আমরা প্রযুক্তির কাছে মুঠোবদ্ধ হবো না।

লেখকঃ ফারহানা লিমা (ব্লগার, আর্টিক্যাল রাইটার) 
নিউজ অফ গ্লোবাল ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here